হারানো ফিতরাত ফিরিয়ে আনার সাথে ইমাম মাহদি (আ.) -এর আগমন ও বিশ্ব শাসন সম্পর্কিত। ইসলামি এস্কেটোলজির দৃষ্টিতে দাজ্জালের ফিতনা এবং ইমাম মাহদির আত্মপ্রকাশ – এই দুই ঘটনা হলো মানুষ ও সৃষ্টির ফিতরাত বিনষ্ট হওয়া এবং তা পুনরুদ্ধারের মধ্যকার এক চূড়ান্ত বৈশ্বিক লড়াই। অর্থাৎ দাজ্জাল আত্নপ্রকাশের পূর্বে মানুষ ও সৃষ্টির সমস্ত ফিতরাত নষ্ট করে ফেলবে। তেমনি ইমাম মাহদি আত্নপ্রকাশের আগেই বিশ্ব একটা পরিবর্তনের প্রাথমিক পরিণতিতে পৌছাতে থাকবে। এই পরিণতি হলো সৃষ্টির সহজাত ধর্ম বা ফিতরাত।
ফিতরাত (Fitrah) আরবি শব্দ, যার অর্থ প্রকৃতিগত স্বভাব, মূল প্রকৃতি, সৃষ্টিগত ধারা, সৃষ্টির স্বাভাবিক ধর্ম বা সহজাত বৈশিষ্ট। অর্থাৎ ফিতরাত হলো মানুষ, প্রকৃতি বা যেকোন সৃষ্টির মূল ও বিশুদ্ধ রূপ, যা কোনো কৃত্রিমতার ছোঁয়া লাগার আগের স্বাভাবিক অবস্থা।
সৃষ্টির এই স্বাভাবিক অবস্থা বা ফিতরাতকে সুকৌশলে নষ্ট করা হয়েছে বিগত কয়েক শতাব্দী ধরে। যা মোটেও প্রয়োজনের খাতিরে হয়নি বা কাকতালীয়ভাবে ঘটেনি বরং তা কুচক্রীদের রূপান্তর প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে করা হয় যা ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি। ফিতরাত, এ্যাস্কেটোলজি এবং বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনায় এসব অন্তর্নিহিত যোগসূত্র খুঁজে দেখার চেষ্টা করবো।
ফিতরাত ও দাজ্জালের ফিতনা
দাজ্জাল আত্নপ্রকাশের পূর্বেই একটি বিশ্বব্যাপী ‘দাজ্জালিক ব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ব্যবস্থার মূল লক্ষ্যই হলো মানুষ ও সৃষ্টির ফিতরাতকে এত বেশি বিকৃত করে দেওয়া, যাতে দাজ্জাল যখন সশরীরে আত্মপ্রকাশ করবে, তখন মানুষ সহজেই তাকে প্রভু বা উদ্ধারকর্তা হিসেবে মেনে নেয়। ফিতরাত হলো মানুষের ভেতরের ঐশ্বরিক আলো ও স্বাভাবিক সৌন্দর্য, আর দাজ্জালের মূল কাজ হলো সেই আলোকে নিভিয়ে দিয়ে মানুষকে সম্পূর্ণ কৃত্রিম, বস্তুবাদী ও পথভ্রষ্ট সত্তায় পরিণত করা।
দাজ্জালের মূল কৌশল বা অস্ত্র হলো “ইনভার্সন” বা বিপরীতকরণ – অর্থাৎ যা সত্য ও প্রাকৃতিক, তাকে অসত্য ও অপ্রাকৃতিক বানিয়ে উপস্থাপন করা; আর যা বিকৃতি, তাকেই আধুনিকতা, স্বাধীনতা বা প্রগতি হিসেবে সাজানো। দাজ্জালি ব্যবস্থা মানুষকে এমন সব বস্তুজাগতিক ভোগ-বিলাস ও কৃত্রিম স্বাধীনতার প্রলোভন দেখায়, যা গ্রহণ করলে মানুষের ভেতরের খাঁটি ফিতরাত নষ্ট হয়ে যায়।
ফিতরাত নষ্টের ক্ষেত্রসমূহ
সৃষ্টিজগতের প্রতিটি উপাদান – মানবজাতি থেকে শুরু করে পরিবেশ, প্রাণী ও মহাজাগতিক ব্যবস্থা – একটি সুনির্দিষ্ট ভারসাম্য, নিয়ম ও স্বাভাবিক রীতির ওপর পরিচালিত হয়। যখনই মানুষ তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক্ষমতা বা অতিরিক্ত লিপ্সার মাধ্যমে এই প্রাকৃতিক ধারায় অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ করে, তখনই ফিতরাতের মূল ছন্দ ব্যাহত হয়। ফিতরাত ফিরিয়ে আনার জন্য প্রাথমিক কাজ হলো সেগুলোকে আগে চিহ্নিত করা। ইসলামি দর্শন, সমাজ ও বিজ্ঞানের আলোকে ফিতরাত নষ্টের প্রধান ক্ষেত্রগুলোকে তুলে ধরা হলো:
আধ্যাত্মিক ক্ষেত্র
ফিতরাতের মূল ভিত্তি হলো এক সৃষ্টিকর্তার উপস্থিতি অনুধাবন করা। উগ্র বস্তুবাদ, চরম নাস্তিক্যবাদ এবং অহংবোধ, অতি-যুক্তিবাদ চর্চার মাধ্যমে মানুষের এই সহজাত বিশ্বাসকে আচ্ছন্ন করা হয়েছে। সুপরিকল্পিত সংশয়বাদের মাধ্যমে খাঁটি ঈমান ও আধ্যাত্মিক কম্পাস কেড়ে নেওয়া হয়েছে। যা অনৈতিক, কৃত্রিম ও ক্ষতিকর – সেটিকে ‘উন্নত’, ‘প্রগতি’, ‘স্বাধীনতা’ হিসেবে সাজানো হয়েছে; আর যা প্রাকৃতিকভাবে সত্য ও পবিত্র – সেটিকে ‘পশ্চাৎপদ’, ‘খ্যাত’, ‘অনুন্নত’, ‘ক্ষতিকর’ হিসেবে চিত্রায়িত করা হয়েছে।
জৈবিক ও পারিবারিক কাঠামো
নারী-পুরুষের স্বভাবজাত ও প্রজননগত বৈচিত্র্যকে অস্বীকার করে কৃত্রিম পরিচয় ও লিঙ্গ রূপান্তরের এজেন্ডা চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। প্রকৃতিগতভাবে মানুষ পুরুষ ও নারী হিসেবে সৃষ্টি হলেও আধুনিক যুগে সামাজিক ও মতাদর্শগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক লিঙ্গ পরিচয় অস্বীকার বা পরিবর্তনের প্রবণতা বাড়ছে। তৃতীয় লিঙ্গের নামে এলজিবিটি মতবাদকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। ফিতরাতের একটি বড় ভিত্তি হলো সামাজিক ও প্রজননগত নিরাপত্তার জন্য বিবাহ এবং পারিবারিক বন্ধন বজায় রাখা। বর্তমানে লিভ-টুগেদার, বিবাহে চরম অনীহা, সন্তান জন্মদানে অনীহা এবং একাকী জীবনযাপনের প্রবণতা সামাজিক নিরাপত্তার প্রাকৃতিক ভিত্তি ধ্বংস করে দিচ্ছে। যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙ্গে নিউক্লিয়ার পরিবার হলো, এখন সেটিও দুর্বল হয়ে পড়েছে। পরিবার প্রথা ভেঙে মানুষ একা হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ্য যৌন সম্পর্ক, বিবাহ বিচ্ছেদ, নগ্নতা, পর্নোগ্রাফি এবং অনিয়ন্ত্রিত সামাজিক আচরণের মাধ্যমে মানুষের স্বভাবজাত লজ্জা ও শালীনতার অনুভূতি নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
দৈহিক ছন্দের পরিবর্তন
অপ্রয়োজনে প্লাস্টিক সার্জারি, অতিরিক্ত সৌন্দর্যচর্চার নামান্তর বা জিনে অপ্রয়োজনীয় রূপান্তরের মাধ্যমে সৃষ্টিকর্তার দেওয়া স্বাভাবিক অবয়ব বদলে ফেলা হচ্ছে। রাতকে বিশ্রামের এবং দিনকে কর্মমুখরতার জন্য সৃষ্টি করা হলেও অনিয়ন্ত্রিত স্ক্রিন টাইম, নাইট-লাইফ এবং কৃত্রিম আলো দিয়ে মানুষের হরমোন ও ঘুমানোর প্রাকৃতিক ছন্দ নষ্ট হয়েছে, মানবদেহের জৈবিক ঘড়ি (সার্কাডিয়ান রিদম) ধ্বংস হয়েছে।
খাদ্য ব্যবস্থা ও পরিবেশ
কৃত্রিম জিন প্রকৌশলের মাধ্যমে বন্ধ্যা বীজ তৈরি করা হয়েছে, যা প্রকৃতির স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রজনন ক্ষমতা কেড়ে নেয়। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে মাটির নিজস্ব যে অনুজীব ও পুষ্টি তৈরির স্বাভাবিক ফিতরাত রয়েছে, তা নষ্ট হয়ে জমি অনূর্বর হয়ে পড়েছে। ইকোসিস্টেম ধ্বংসের মাধ্যমে হাজার হাজার অণুজীব ও প্রাণীকে বিলুপ্তির মুখে ঠেলে দিয়ে পুরো খাদ্যশৃঙ্খলের ভারসাম্য নষ্ট করা হচ্ছে। কৃত্রিম প্রযুক্তি (যেমন: জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং বা সোলার বিকিরণ নিয়ন্ত্রণ) ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃতির নিজস্ব আবহাওয়া ও ঋতুচক্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। বন্যপ্রাণীদের প্রাকৃতিক আবাস্থল ধ্বংস করে খাঁচায় বা কৃত্রিম পরিবেশে বন্দি করা এবং ফার্মিংয়ের নামে অ্যান্টিবায়োটিক ও হরমোন প্রয়োগ করে প্রাকৃতিকভাবে তাদের বড় হওয়া ও বংশবৃদ্ধির প্রক্রিয়া বিকৃত করা হচ্ছে। বায়ুমণ্ডলে রাসায়নিক ছিটিয়ে (যেমন: সোলার রেডিয়েশন ম্যানেজমেন্ট বা সিড ক্লাউডিং) কৃত্রিমভাবে রোদ বা বৃষ্টি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা, যা দীর্ঘমেয়াদে আবহাওয়াকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে। অগণিত স্যাটেলাইট ও মহাকাশ বর্জ্যের মাধ্যমে পৃথিবীর চারপাশের বায়ুমণ্ডল কৃত্রিম তরঙ্গে ভরে গেছে। এসব কোনকিছুর জন্যই সাধারণ মানুষ দায়ী নয়।
শিক্ষাব্যবস্থা ও জ্ঞানতত্ত্বের বিকৃতি
ঐতিহ্যগতভাবে শিক্ষাব্যবস্থার ফিতরাত ছিল মানুষকে স্রষ্টার সৃষ্টি, নৈতিকতা এবং বিশ্বজগতের গভীর রহস্য অনুধাবন করতে শেখানো। আধুনিক মেকানিজমে শিক্ষা ব্যবস্থাকে এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যেখানে মানুষকে কেবল এক-একটি অর্থনৈতিক ‘পণ্য’ বা ‘কর্পোরেট দাস’ হিসেবে গড়ে তোলা হয়। “কোনো কিছুই পরম সত্য নয়, সবকিছুই আপেক্ষিক” -এই দর্শন ছড়িয়ে দিয়ে ভালো-মন্দ, সত্য-মিথ্যার ধ্রুপদী ফিতরি মানদণ্ডকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
ডিজিটাল অ্যালগরিদম ও মানসিক দাসত্ব
সোশ্যাল মিডিয়া অ্যালগরিদমগুলো মানব মস্তিষ্কের ‘ডোপামিন’ নিঃসরণকে সুপরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ডিজাইন করা। এগুলো মানুষের ধৈর্য, গভীর চিন্তা করার ক্ষমতা এবং নীরবতার ভেতরের প্রশান্তি অনুধাবন করার স্বাভাবিক ফিতরাতকে কেড়ে নিয়ে মানুষকে একটি সার্বক্ষণিক অস্থিরতা ও মনোযোগহীনতার মধ্যে বন্দি করে ফেলেছে।
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার রূপান্তর
সুস্থ জীবনধারা ও শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করার ফিতরি উপায়ের বদলে আজীবন ওষুধনির্ভর করে রাখার একটি বৈশ্বিক বাণিজ্য তৈরি করা হয়েছে। হতাশা, দুঃখ বা স্ট্রেসের মতো স্বাভাবিক মানবিক অনুভূতিগুলোর সমাধান আধ্যাত্মিকতা, পারিবারিক সহানুভূতি বা প্রকৃত জীবনধারা পরিবর্তনের মাধ্যমে না করে কেবল সিন্থেটিক পিলের ওপর নির্ভরশীল করে তোলা হয়েছে।
আধুনিক নগরায়ন
বিশাল কংক্রিটের জঙ্গল এবং হাই-রাইজ বিল্ডিং নির্মাণের ফলে মানুষ মাটি, গাছপালা, খোলা আকাশ এবং বিশুদ্ধ বাতাস থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং মাটির সান্নিধ্য মানুষের মনকে শান্ত রাখে। আধুনিক কৃত্রিম নগর ব্যবস্থা মানুষকে সার্বক্ষণিক মেটাল, প্লাস্টিক ও গ্লাসের ভেতরে আটকে রেখে মানসিক বিষণ্নতা বাড়াচ্ছে।
কৃত্রিম ক্যালেণ্ডার নির্ভর জীবন
চন্দ্র, সূর্য ও ঋতুচক্রের সাথে সমন্বয় করে মানুষের জীবনের গতি নির্ধারণ করা ছিল স্বাভাবিক ফিতরাত। কিন্তু আধুনিক শিল্পায়ন ও ঘড়ির কাঁটার ওপর ভিত্তি করে গড়ে তোলা কঠোর শিডিউল মানুষের নিজস্ব দেহ ঘড়িকে পুরোপুরি অকার্যকর করে দিয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বকীয়তা হরণ
মানুষের সৃজনশীলতা, চিন্তা ও যোগাযোগের ফিতরি ক্ষমতাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আলগোরিদমের হাতে সমর্পণ করার একটি সুপরিকল্পিত ধারা শুরু হয়েছে। এর ফলে মানুষের নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বকীয়তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই করার ক্ষমতা আস্তে আস্তে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়বে।
আলো-আঁধারের বিকৃতি
রাতকে বিশ্রামের ও নিস্তব্ধতার জন্য সৃষ্টি করা হলেও অতি-আলোকায়নের (Light Pollution) মাধ্যমে রাতের প্রাকৃতিক আঁধার বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এর ফলে মানুষের মেলোটোনিন হরমোন নিঃসরণ ব্যাহত হয়, পাশাপাশি লাখ লাখ প্রাণী এবং দিবাচর ও নিশাচর (Diurnal, Nocturnal) পোকামাকড়ের জীবনচক্র সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। রাতের অন্ধকারকে অতিরিক্ত কৃত্রিম আলোয় ঢেকে দেওয়া এবং শব্দদূষণের মাধ্যমে নিস্তব্ধতার যে প্রাকৃতিক ছন্দ রয়েছে তা ধ্বংস হয়; যা পাখি, কীট-পতঙ্গ ও মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি করে।
প্রাচীনকাল থেকেই রাতের আঁধার মানুষকে বিনয়ী করত, প্রাকৃতিকভাবে একা হওয়ার অনুভূতি দিত এবং নিজের ক্ষুদ্রতা অনুধাবনে সাহায্য করত। আধুনিক শহরগুলোতে ২৪ ঘণ্টা তীব্র আলো জ্বালিয়ে রাতের আঁধারকে একদম মুছে ফেলা হয়েছে। এর ফলে মানুষ যেমন মহাবিশ্বের বিশালতা, তারকাময় আকাশ দেখতে পায় না, তেমনি নিজের ভেতরের অন্তর্দৃষ্টি চর্চার সুযোগও হারায়।
মনস্তাত্ত্বিক ও মানবিক সম্পর্ক
বাস্তব সামাজিক সম্পর্ক ও আত্মীয়তার বদলে ভার্চুয়াল দুনিয়ার অতিরিক্ত আসক্তি, যার ফলে মানুষের মানবিক সহানুভূতি, মানসিক প্রশান্তি ও সামাজিক সংবেদনশীলতা কমে যাচ্ছে। অতিরিক্ত কনজিউমারিজম এবং বস্তুগত প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মানুষকে মানসিক অস্থিরতার মধ্যে ঠেলে দেওয়া, যা আত্মার অন্তরের শান্তি নষ্ট করে।
এরকম প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃত্রিমতার এমন একটি জাল বিছানো হয়েছে – যাতে মানুষ কোনোভাবেই তার খাঁটি প্রাকৃতিক ও ঐশ্বরিক ফিতরাতের কাছে ফিরে যেতে না পারে।
ফিয়াট কারেন্সি ও অর্থনীতির ফিতরাত
অর্থনীতি ও মুদ্রা দর্শনের দৃষ্টিতে স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা বা সুনির্দিষ্ট বস্তুগত মূল্যের পরিবর্তে ফিয়াট কারেন্সি (Fiat Currency) বা কাগজ-ভিত্তিক সুদের ব্যাংক ব্যবস্থার প্রচলন ফিতরাত নষ্টের একটি অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক ক্ষেত্র। সৃষ্টির শুরু থেকে মানবসমাজ এমন বস্তু দিয়ে লেনদেন করত, যার নিজস্ব অন্তর্নিহিত মূল্য ছিল (যেমন: সোনা, রূপা, শস্য বা গবাদিপশু)। কারণ সোনা বা রূপা নিজেই সম্পদ, তাই তা কখনো রাতারাতি শূন্য হয়ে যায় না। কিন্তু ফিয়াট কারেন্সির নিজের কোনো অন্তর্নিহিত মূল্য নেই। এটি কেবল সরকারের আদেশে বা আইনি আদেশে এক টুকরো কাগজের উপর একটি সংখ্যা বসিয়ে দেওয়া মূল্য। কাগুজে মুদ্রা প্রবর্তন করে মানবজাতিকে প্রকৃত বস্তুগত সম্পদ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এক ধরনের কৃত্রিম বা কাল্পনিক মূল্যের ওপর অভ্যস্ত করানো হয়েছে। ফিয়াট কারেন্সির মাধ্যমে যেভাবে অর্থনীতির ফিতরাতকে নষ্ট করা হয়েছে:
➥ স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত টাকা ছাপিয়ে মুদ্রা অবমূল্যায়ন করা কঠিন ছিল। কিন্তু কাগুজে মুদ্রায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো যখন ইচ্ছা সীমাহীন কাগজ বা ডিজিটাল টাকা ছাপাতে পারে। একজন মানুষ সারাজীবন পরিশ্রম করে যে সঞ্চয় করে, মুদ্রাস্ফীতির মাধ্যমে সেই কাগুজে টাকার মান প্রতিনিয়ত কমতে থাকে। এতে মানুষের ঘাম ঝরানো উপার্জনের প্রকৃত মূল্য নিজের অলক্ষ্যেই চুরি হয়ে যায়।

➥ আধুনিক ফিয়াট মানি ব্যবস্থার মূল চালিকাশক্তি হলো ‘ফ্র্যাকশনাল রিজার্ভ ব্যাংকিং’ এবং সুদ। এখানে নতুন কাগুজে টাকা বাজারে আসে ঋণের মাধ্যমে, যা সুদের ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর ‘সুদ’ হলো মানব সমাজের নৈতিক ও অর্থনৈতিক ফিতরাতকে ধ্বংসকারী সবচেয়ে বড় অপরাধ। সোনা-রূপার মুদ্রায় সুদের মাধ্যমে কৃত্রিম ঋণ তৈরি করা কঠিন হলেও, কাগুজে মুদ্রা আধুনিক সুদি ব্যবস্থাকে বিশ্বব্যাপী বাধ্যতামূলক করে তুলেছে।
➥ কারো কাছে স্বর্ণ থাকলে তার পূর্ণ মালিকানা তার নিজের। কিন্তু কাগুজে টাকা বা আধুনিক ডিজিটাল ক্যাশলেস মানি সিস্টেমের ক্ষেত্রে অর্থের চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণ থাকে সরকার, ব্যাংক ও কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষের হাতে। ভবিষ্যৎ মুদ্রা ব্যবস্থা ইউনিফায়েড ডিজিটাল কারেন্সি চালু হলে এর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ সরাসরি একটিমাত্র বৈশ্বিক ব্যবস্থার উপর চলে যাবে। কর্তৃপক্ষ চাইলে মুহূর্তের মধ্যেই একজন মানুষের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ করে তাকে নিঃস্ব করে দিতে পারে। এই কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ মানুষের স্বাভাবিক স্বাধীনতা ও সম্পত্তির ওপর প্রকৃত অধিকারের ফিতরাতকে ক্ষুণ্ন করে।
➥ মানুষ যতটুকু উপার্জন করে, ততটুকুর ভেতরে সন্তুষ্ট থেকে স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকাই তার স্বাভাবিক নিয়ম। আধুনিক ইএমআই, ক্রেডিট কার্ড, হোম লোন ও পে-লেটার ব্যবস্থার মাধ্যমে একজন মানুষকে তার জীবনের ২০–৩০ বছর আগেই বিক্রি করে দেওয়া হয়। এটা সুপরিকল্পিত ডেট-ট্র্যাপ। মানুষ সারাজীবন কেবল সুদি ঋণ শোধ করার চিন্তায় এক অদৃশ্য অর্থনৈতিক দাসে পরিণত থাকে, যা তার আসল স্বাধীনতা ও মানসিক স্বস্তির ফিতরাত কেড়ে নেয়।
ইমাম মালিক (র.), ইমাম গাজ্জালী (র.) এবং ইবনে তাইমিয়া (র.) -এর মতো ক্লাসিক্যাল ফকিহ ও আধুনিক ইসলামি অর্থনীতিবিদরা হুঁশিয়ার করেছিলেন যে, সোনা-রূপার বদলে এমন কোনো মুদ্রা বা কাগজ চালু করা – যার পেছনে আসল সম্পদ নেই এবং যা সহজে বাড়িয়ে মানুষকে প্রতারিত করা যায় – তা সমাজের সার্বিক ইনসাফ ও ফিতরাত নষ্টের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।
প্রকৃতিপ্রদত্ত ফিতরাত বিনষ্ট করার পরিধি কেবল দৃশ্যমান কিছু সমাজ বা অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। সৃষ্টির অত্যন্ত সূক্ষ্ম জায়গাগুলোতেও এই বিকৃতি ঘটানো হয়েছে:
➥ মানুষের চিন্তা করার ফিতরি মাধ্যম হলো ভাষা। আধুনিক যুগে সংক্ষিপ্ত রূপ, সংকেত, ইমোজি এবং অগভীর অনলাইন পরিভাষার অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে মানুষের শব্দভাণ্ডার ও চিন্তার গভীরতা কমে যাচ্ছে। বহু ধ্রুপদী সামাজিক ও নৈতিক শব্দের অর্থ সুপরিকল্পিতভাবে বদলে দেওয়া হয়েছে। যেমন, সংযম বা লজ্জাকে আধুনিক পরিভাষায় সীমাবদ্ধতা বা পশ্চাৎপদতা হিসেবে দেখানো হয়, আর অনিয়ন্ত্রণকে দেখানো হয় স্বাধীনতা হিসেবে।
➥ মানুষের আত্মার ফিতরাত হলো মাঝে মাঝে নীরবতা ও নির্জনতায় নিমগ্ন হয়ে আত্মপর্যালোচনা করা। ডিজিটাল ডিভাইস, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এবং নোটিফিকেশনের মাধ্যমে মানুষের জীবনকে এমনভাবে কোলাহলপূর্ণ করে তোলা হয়েছে যে, মানুষ একা বা নীরব থাকতে ভয় পায়। নীরবতার এই ফিতরাত হারিয়ে যাওয়ার কারণে মানুষের মানসিক প্রশান্তি ও আত্মিক গভীরতা বিনষ্ট হচ্ছে।
➥ মানুষের হৃদয় প্রাকৃতিকভাবে অন্যের কষ্টে ব্যথিত হওয়ার কথা। কিন্তু মিডিয়া, নিউজ ফিড এবং ভায়োলেন্ট ভিডিও গেমের মাধ্যমে ক্রমাগত সহিংসতা ও অন্যায় দেখতে দেখতে মানুষের সংবেদনশীলতা ভোঁতা হয়ে গিয়েছে। মানুষ এখন চোখের সামনে বাস্তব দুর্ঘটনা বা অন্যায় দেখলে তা প্রতিহত করার ফিতরি তাগিদ অনুভব করার বদলে মোবাইল বের করে ভিডিও করার মতো বিকৃত মানসিক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।
➥ শিশুদের ফিতরাত হলো ধুলোবালি, কাদামাটি, উন্মুক্ত মাঠ এবং শারীরিক খেলাধুলার মাধ্যমে হাত-পায়ের স্পর্শে প্রকৃতিকে চেনা। কিন্তু শৈশবকে স্ক্রিনের ভেতরে বন্দি করে এবং টিভি, মোবাইল ডিভাইসের মাধ্যমে অতি-শৈশব থেকেই প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্ট দেখতে দেখতে স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক ও শারীরিক বিকাশের ছন্দ ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
➥ প্রাকৃতিকভাবে খাবারের যে আসল ও মৃদু স্বাদ থাকে, তা কৃত্রিম স্বাদবর্ধক (MSG, হাই-ফ্রুক্টোজ কর্ন সিরাফ, অতিরিক্ত সোডিয়াম) দিয়ে বদলে দেওয়া হয়েছে। এর ফলে মানুষের জিব ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক স্বাদের ফিতরি অনুভূতির সেন্সরগুলো নষ্ট হয়ে গেছে। প্রাকৃতিক ফুল, মাটি বা বাতাসের ঘ্রাণের বদলে সার্বক্ষণিক সিন্থেটিক পারফিউম ও রাসায়নিক সুগন্ধি ব্যবহারের ফলে মানুষের ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের প্রাকৃতিক স্পর্শ হ্রাস পাচ্ছে।
➥ গুড় বহু রোগের মহৌষধ হিসেবে সমাদৃত ছিল। কিন্তু এই ধারনা আমাদের মন থেকে আজ প্রায় মুছেই গেছে। মুদির দোকানে গুড় খুঁজে পাওয়া যায় না। বিপরীতে ক্ষতিকর রূপান্তরিত চিনি বাজার দখল করে নিয়েছে। ভোক্তার মাঝে চিনির চাহিদা তৈরি হয়েছিল জন্য চিনি বাজারে আসেনি। ব্রিটিশদের সুগার মিল চালুর আদ্যোপান্ত ঘাটলে জানতে পারবেন। এটি পরিষ্কারভাবে চক্রান্তকারীদের ফিতরি ব্যবস্থা ভেঙ্গে রূপান্তর প্রক্রিয়ার অংশ। আসল তেলের পরিবর্তে রূপান্তরিত রিফাইন্ড তেলে বাজার দখল হয়ে গেছে। কুচক্রীরা শুধু খাবারের বীজই বদলায়নি; সেই বীজের খাবারকেও আবার নানাভাবে প্রক্রিয়াজাত করে বাজারে ছাড়ে (যেমন – সাদা আটা, সাদা চাল)।
➥ পরিবার ও সমাজে প্রবীণদের জ্ঞান, দোয়া এবং উপস্থিতির একটি স্বাভাবিক ফিতরি মর্যাদা ছিল। আধুনিক ভোগবাদী সমাজব্যবস্থায় বয়স্ক মানুষকে ‘অকার্যকর’ বা ‘অর্থনৈতিক বোঝা’ হিসেবে গণ্য করে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন করে বৃদ্ধাশ্রমের মতো কৃত্রিম ব্যবস্থায় পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে – যা পারিবারিক ও সামাজিক অনুভূতির ফিতরাতকে ক্ষুণ্ন করে।
➥ কল্যাণকর ফিতরাতের একটি বড় অংশ হলো নিজের নশ্বরতা বা মৃত্যুর কথা স্মরণ করে জীবনকে অর্থবহ করা ও অনৈতিক কাজ থেকে বিরত থাকা। কিন্তু মৃত্যুকে পর্যন্ত ‘ট্যাবু’ বানানো হয়েছে। আধুনিক সংস্কৃতি মৃত্যুকে একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বা এড়িয়ে যাওয়ার মতো বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করে মানুষকে চিরস্থায়ী জাগতিক ভোগের মোহে অন্ধ করে রাখে, যা মানুষের আখেরাতমুখী ও দায়িত্বশীল হওয়ার ফিতরাতকে ধ্বংস করে।
মানবজীবনের প্রতিটি বাঁকেই কৃত্রিমতার একটি জাল বিছানো হয়েছে – যাতে মানুষ তার স্বভাবজাত মানবিকতা, সহমর্মিতা এবং ঐশ্বরিক ফিতরাতকে পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে এক যান্ত্রিক সত্তায় পরিণত হয়।
➥ ফিতরাতের বৈশিষ্ট হলো মানুষ মাটি, কাঠ, পাথর, পানির ধারা ও রুক্ষ-মসৃণ নানা বস্তু স্পর্শ করে বিশ্বকে অনুভব করবে। আধুনিক মানুষকে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একটি মসৃণ কাঁচের স্ক্রিনে আঙুল ঘষতে (স্মার্ট ফোন) অভ্যস্ত করা হয়েছে। বাস্তব বস্তুর নানাবিধ টেক্সচার বা স্পর্শের অনুভূতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে মানুষের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
➥ তামা, কাসা, পিতল একারণে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি যে এগুলো অনেক দামি বা দুর্লব ধাতু। বরং বিলুপ্ত করা হয়েছে কারণ এগুলো উপকারী! পরিবর্তে প্লাস্টিক এসেছে। এক/দুই প্রজন্ম আগেও গরীব কৃষকের ঘরে কাঁসার জগ ছিল। এখন হাতে দামি মোবাইল কিন্তু রান্নঘর প্লাস্টিকের দখলে। রান্নাঘর থেকে যথাসম্ভব প্লাস্টিক পণ্য ছুঁড়ে ফেলে দিন।
➥ মানুষের স্বাভাবিক ফিতরাত হলো অন্য মানুষের প্রতি প্রাথমিক আস্থাশীলতা ও সহানুভূতি রাখা। আধুনিক বাণিজ্যিক সমাজ এমনভাবে গড়ে তোলা হয়েছে যেখানে মুখের কথা, আমানতদারি বা নৈতিক প্রতিশ্রুতির কোনো মূল ফিতরি ভিত্তি নেই; সবকিছুই সূক্ষ্ম আইনি চুক্তি, সিসিটিভি ক্যামেরা ও কৃত্রিম নজরদারির ওপর নির্ভরশীল। এতে মানুষের ভেতরের ‘আমানতদারিতা’ ও ‘সততার’ ফিতরি গুণটি অলস ও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে।
➥ বিশ্রামের ফিতরি অর্থ হলো শারীরিক ও মানসিকভাবে স্থির হওয়া, নীরবতায় থাকা এবং মনের চাপ মুক্ত করা। কিন্তু আধুনিক যুগে ‘বিশ্রাম’ মানেই হলো উচ্চমাত্রার উদ্দীপনা – যেমন হাই-স্পিড ভিডিও, অ্যাকশন গেম, রোমাঞ্চকর সিরিজ বা সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রোলিং। এতে শরীর হয়তো এক জায়গায় বসে থাকছে, কিন্তু মস্তিষ্ক সারাক্ষণ তীব্র উদ্দীপনার মধ্যে থেকে অতিরিক্ত ক্লান্ত ও বিষণ্ণ হয়ে পড়ে।
➥ মা ও সন্তানের শারীরিক ও মানসিক বন্ধনের মূল ফিতরি ভিত্তি হলো প্রাকৃতিক গর্ভধারণ ও প্রসব। বাণিজ্যিকভাবে সারোগেসি, কৃত্রিম গর্ভাশয় এবং ল্যাবরেটরিতে ভ্রূণ ডিজাইনের মতো প্রযুক্তি মাতৃগর্ভ ও সন্তানের পবিত্র সম্পর্কের ফিতরাতকে কেবল একটি আর্থিক পরিষেবা বা কৃত্রিম পণ্যে রূপান্তর করছে। বাংলাদেশে এগুলোর প্রচলন তেমন না থাকলেও অপ্রয়োজনীয় সিজারের পিছনে বাণিজ্যিক ও সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত মাতৃত্ব ও শিশু জন্মের সহজাত ভিত্তিকে নষ্ট করে দিয়েছে।
➥ জীবনে প্রিয়জনকে হারানো বা কোনো কষ্টে বিষণ্ণ ও শোকাহত হওয়া মানুষের সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও পবিত্র ফিতরাত। শোকের মাধ্যমেই মানুষের আত্মা পরিপক্ক হয়। আধুনিক ‘পজিটিভিটি কালচার’ এবং ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি যে কোনো ধরনের দুঃখ-কষ্টকে একটি ‘মানসিক রোগ’ হিসেবে চিহ্নিত করে দ্রুত ওষুধ খেয়ে তা চেপে যাওয়ার তাগিদ দেয়। কৃত্রিমভাবে সারাক্ষণ ‘সুখী’ থাকার এই ভণ্ডামি মানুষের আত্মিক গভীরতা কেড়ে নিচ্ছে।
সবকিছুর ভেতরেই কৃত্রিমতার নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে যার চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো মানুষকে তার আসল ‘সৃষ্টিকর্তা-প্রদত্ত ফিতরাত’ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে একটি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও কৃত্রিম উপাদানে পরিণত করা।
➥ ফিতরাতের বৈশিষ্ট অনুযায়ী মানুষের শরীর ও মনকে প্রকৃতির ঋতু পরিবর্তনের (গ্রীষ্মের উত্তাপ, বর্ষার আর্দ্রতা, শীতের শীতলতা) সাথে মানিয়ে নেওয়ার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এই ঋতু পরিবর্তন মানুষের ইমিউন সিস্টেম ও মনস্তত্ত্বকে পরিপক্ক করে। কিন্তু বাসাবাড়ি, অফিস ও গাড়িতে ২৪ ঘণ্টা এসি বা হিটারের কৃত্রিম তাপমাত্রা ব্যবহারের ফলে মানুষ আবহাওয়া ও ঋতুর প্রাকৃতিক স্পর্শ থেকে একদম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, যা মানুষের শরীরকে স্বাভাবিক প্রতিকূলতা সহ্য করার ফিতরি ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে।
➥ মানুষের সামাজিক ফিতরাতের একটি বড় ভিত্তি হলো তার আশেপাশে থাকা মানুষদের (প্রতিবেশী) জানা, তাদের সুখে-দুঃখে পাশে দাঁড়ানো এবং একটি পারস্পরিক সুরক্ষাবলয় তৈরি করা। আধুনিক শহরগুলোতে একই বিল্ডিংয়ে বছরের পর বছর পাশাপাশি থেকেও কেউ কাউকে চেনে না। ফিজিক্যাল কমিউনিটি বা সামাজিক নিরাপত্তার আসল ফিতরাত ভেঙে দিয়ে মানুষ এখন ভার্চুয়াল সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল।
➥ ফিতরাতের বৈশিষ্ট অনুযায়ী মানুষ নদী, ঝরনা বা প্রাকৃতিকভাবে প্রবাহিত পানির শব্দ শুনে এবং তাতে স্পর্শ করে মানসিক প্রশান্তি লাভ করে। কিন্তু আবদ্ধ প্লাস্টিক বোতলের প্রক্রিয়াজাত পানি পান করা এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ের বদলে পাইপলাইনের কেমিক্যালযুক্ত পানির ওপর সার্বক্ষণিক নির্ভরতা মানুষের ইন্দ্রিয় ও শরীরের ওপর পানির প্রাকৃতিক সুপ্রভাব কমিয়ে দিয়েছে।
➥ মানুষের চরিত্র ও মানসিক শক্তির বিকাশ ঘটে অভাব মোকাবিলা করে, কোনো কিছুর জন্য অপেক্ষা করা এবং ধৈর্যের পরীক্ষা দেওয়ার মাধ্যমে যা ফিতরাতের অন্যতম বড় অনুঘটক। আধুনিক ‘ওয়ান-ক্লিক’ কালচার (যেমন: এক ক্লিকে খাবার, এক ক্লিকে বিনোদন, এক ক্লিকে কেনাকাটা) মানুষের ভেতর থেকে অপেক্ষা ও ধৈর্যের ফিতরি শক্তিকে কেড়ে নিয়েছে। ফলে সামান্যতম অপ্রাপ্তি বা দেরিতে মানুষ চরম অস্থির ও বিষণ্ণ হয়ে পড়ে।
➥ পরিবারের সবাই মিলে কাঁচা বাজার করা, নিজ হাতে রান্না করা এবং একই দস্তরখানায় (ডাইনিং টেবিলে) বসে একসাথে খাবার খাওয়ার ভেতরে ভালোবাসা, বরকত ও সামাজিক বন্ধনের ফিতরি ভিত্তি লুকিয়ে আছে। এখন ডেলিভারি অ্যাপ, মাইক্রোওয়েভ মিল এবং স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে একা একা খাবার খাওয়ার অভ্যাস মানুষের পারিবারিক হৃদ্যতা ও খাবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা বোধের ফিতরাত নষ্ট করেছে।
➥ মানুষের চোখ প্রাকৃতিকভাবে সবুজ গাছপালা, দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ, মাটির রঙ এবং উন্মুক্ত দৃশ্য দেখে শান্ত হওয়ার জন্য গঠিত। কিন্তু বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন, মেটালিক হাইরাইজ বিল্ডিং এবং অনবরত জ্বলতে থাকা কৃত্রিম স্ক্রিনের তীব্র আলো মানুষের দৃষ্টির স্বাভাবিক প্রশান্তি কেড়ে নিয়ে চোখে ও মস্তিষ্কে সার্বক্ষণিক এক ধরনের ক্লান্তি তৈরি করছে।
আধুনিক যুগের বাণিজ্যিক ও অতি-নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাগুলো মানুষের জীবন থেকে প্রাকৃতিক ছন্দ এবং আত্মিক গভীরতা ছেঁটে ফেলে তাকে এক ধরনের কৃত্রিম চাকা ঘোরানোর সামগ্রীতে রূপান্তর করে। এই বিকৃতি থেকে ফিতরাত রক্ষা করাই বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় আধ্যাত্মিক ও মানসিক সংগ্রাম।
➥ মানুষের মন প্রাকৃতিকভাবেই কৌতূহলী। নিরপেক্ষভাবে সত্য জানা, অভিজ্ঞতা থেকে শেখা এবং প্রশ্ন তুলে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ফিতরি ক্ষমতা মানুষের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু আধুনিক সার্চ ইঞ্জিন, নিউজ অ্যালগরিদম ও সোশ্যাল মিডিয়া মানুষকে কেবল সেটাই দেখায়, যা তার আগের পছন্দ বা কোনো বাণিজ্যিক এজেন্ডার সাথে মেলে। এই ইনফরমেশন বাবল ও অ্যালগরিদমিক ফিল্টারের ফলে মানুষের নিরপেক্ষ চিন্তার স্বাধীনতা ও সার্বিক সত্য অনুসন্ধানের ফিতরাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে মানুষ একমুখী চিন্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রোপাগান্ডার দাসে পরিণত হয়েছে।
➥ মানুষের শরীর ও মনের একটি বড় চাহিদা হলো সরাসরি উন্মুক্ত মাঠে দৌড়ানো, সাঁতার কাটা, কুস্তি বা শারীরিক খেলায় অংশ নেওয়া। মানুষকে মাঠ থেকে সরিয়ে নিয়ে কৃত্রিম ই-স্পোর্টস, ভিডিও গেম অথবা স্ক্রিনে বসে অন্যের খেলা দেখার ‘স্কেপটেটর কালচারে’ অভ্যস্ত করা হয়েছে। এর ফলে মানুষের শারীরিক শক্তি, রক্ত সঞ্চালন ও বাস্তবিক প্রতিযোগিতার ফিতরি আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে।
➥ অন্যায় করলে অনুশোচনা আসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে তার প্রকৃত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার মাধ্যমে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বাভাবিক নিয়ম রয়েছে। আধুনিক আইনি ও বাণিজ্যিক সিস্টেমে বড় বড় অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত অপরাধ করে কেবল কিছু টাকা জরিমানা দিয়ে পার পাওয়া যায়। এর ফলে অপরাধের মানসিক অপরাধবোধ এবং সমাজ থেকে প্রকৃত ইনসাফের ফিতরি অনুভূতি বিলুপ্ত হয়েছে।
অতি-বাণিজ্যিক ও যান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা মানুষের চিন্তা, বিচারবোধ ও মানসিকতায় এমন এক অদৃশ্য শিকল পরিয়ে দিয়েছে – যার ফলে মানুষ বাহ্যিকভাবে নিজেকে স্বাধীন ভাবলেও ভেতরে ভেতরে তার মৌলিক মানবিক ও আত্মিক ফিতরাত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন।
➥ ফিতরাতের বৈশিষ্ট হলো মানুষ যখন কোনো বিপন্ন মানুষকে সরাসরি নিজের হাতে সাহায্য করে, তখন উভয়ের মধ্যে এক গভীর আত্মিক ও মানবিক বন্ধন তৈরি হয়। দাতাগোষ্ঠী বিনয়ী হয় এবং গ্রহীতা ভালোবাসায় সিক্ত হয়। আধুনিক যুগে দান-সদকাকে বৃহৎ এনজিও, ট্যাক্স-রিবেট ও কর্পোরেট সিএসআর -এর বাণিজ্যিক কাঠামোয় বন্দি করা হয়েছে। এর ফলে দাতা ও গ্রহীতার মধ্যকার মানবিক সংবেদনশীলতা ও ভালোবাসার ফিতরি অনুভূতিটি হারিয়ে গিয়ে সাহায্য কেবল একটি ঠান্ডা প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে।
➥ বৃষ্টিতে ভেজা, প্রথম বৃষ্টির পর মাটির সোঁধা গন্ধ শোঁকা এবং প্রকৃতির সাথে মিশে যাওয়ার মধ্যে মানুষের আত্মার এক অকৃত্রিম আনন্দ লুকানো থাকে। অতিরিক্ত রাসায়নিক দূষণ ও কৃত্রিম জীবনযাত্রার কারণে মানুষ বৃষ্টিতে ভিজতে বা মাটিতে পা রাখতে ভয় পায়। প্রাকৃতিক উপাদানগুলোকে ‘রোগের কারণ’ বা ‘অপরিচ্ছন্নতা’ হিসেবে দেখার এক মানসিক অ্যালার্জিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে।
➥ সমাজে কোনো ভুল বা দ্বন্দ্ব হলে স্থানীয় মুরুব্বি বা পরিবারের মধ্যস্থতায় ক্ষমা ও আপসের মাধ্যমে সমাধান করা ছিল ফিতরাতের নিয়ম। সাধারণ সামাজিক বিরোধগুলোকেও উকিল, আদালত ও আইনি লড়াইয়ের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়, যাতে বাণিজ্যিক আইনি খাত লাভবান হয় – কিন্তু দুই পক্ষের শত্রুতা চিরস্থায়ী রূপ নেয় এবং সামাজিক ক্ষমার ফিতরাত ধ্বংস হয়।
➥ মানুষের জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোতে পরিবার, সন্তান ও প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে থেকে সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে জপতে শান্তিতে বিদায় নেওয়া অত্যন্ত পবিত্র একটি ফিতরি অধ্যায়। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার বাণিজ্যিক চাপে মানুষকে জীবনের শেষ দিনগুলোতে প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে আইসিইউ -এর পাইপ, মনিটর ও কৃত্রিম নিঃশ্বাসের যন্ত্রের মাঝে একা ছেড়ে দেওয়া হয়। এর ফলে মৃত্যুর যে গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা পরিবার ও সমাজের পাওয়ার কথা ছিল, তা যান্ত্রিকতার আড়ালে হারিয়ে যায়।
জন্ম থেকে শুরু করে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করার মতো মানব অস্তিত্বের অতি-পবিত্র জায়গাগুলোতেও কৃত্রিমতার এমন একটি বাণিজ্যিক ও চক্রান্তের ছাঁচ বসিয়ে দেওয়া হয়েছে – যাতে মানুষ তার প্রতিটি অনুভূতির জন্য এই আধুনিক যান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।
ফিতনা, ফিতরাত ও সূরা কাহাফ
সূরা আল-কাহাফে আল্লাহ তাআলা চারটি পৃথক ঐতিহাসিক কাহিনীর মাধ্যমে মানব ইতিহাসের চারটি প্রধান ফিতনাকে চিহ্নিত করেছেন। মাসীহ দাজ্জাল এবং তার বাহিনীর শেষ জামানার ব্যবস্থার মূল কৌশল হলো এই চারটি ফিতনাকে চরমে নিয়ে যাওয়া। একই সাথে এই চারটির বিপরীতে চারটি নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক ও ব্যবহারিক সমাধান বা দুর্গ নির্দেশ করা হয়েছে, যা শেষ জামানার ফিতনা থেকে ফিতরাত ও ঈমান রক্ষার মূল হাতিয়ার:
১. ঈমানের ফিতনা ➔ সহবত ও সৎ সঙ্গ
➥ কাহিনী: আসহাবে কাহফের যুবকদের ঘটনা – যারা দ্বীন রক্ষায় রাজপ্রাসাদ ও সমাজ ছেড়ে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন।
➥ দাজ্জালি ফিতনা: একত্ববাদ ও ঈমানকে ক্ষুণ্ন করে বস্তুবাদ, নাস্তিক্যবাদ ও সুপরিকল্পিত সংশয়বাদ ছড়িয়ে দেওয়া।
➥ প্রতিরোধের মাধ্যম: পবিত্র সঙ্গ ও পারস্পরিক সুদৃঢ় বন্ধন। সূরা কাহফে আল্লাহ তাআলা নির্দেশ দেন:
যারা সকাল-সন্ধ্যায় তাদের রবকে ডাকে, তাদের সাথে তোমার মনকে ধরে রাখো এবং পার্থিব জীবনের সৌন্দর্যের আশায় তোমার দৃষ্টি তাদের থেকে ফিরিয়ে নিও না।” (সূরা কাহাফ: ২৮)
➥ বাস্তব প্রয়োগ: এককভাবে সত্যের ওপর টিকে থাকা কঠিন। শেষ জামানায় ঈমানি ফিতরাত বাঁচাতে সৎ, দ্বীনদার এবং শেষ জামানা সম্পর্কে সচেতন মানুষের সঙ্গ ধরে রাখা বাধ্যতামূলক।
২. সম্পদ ও রিযিকের ফিতনা ➔ আখেরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব অনুধাবন
➥ কাহিনী: দুটি বাগানের মালিক ধনীর অহংকার এবং নিঃস্ব মুমিনের ঈমানি দৃঢ়তার ঘটনা।
➥ দাজ্জালি ফিতনা: ফিয়াট মানি, অনিয়ন্ত্রিত ঋণ, কৃত্রিম বস্তুপূজা এবং চরম অর্থনৈতিক দাসত্ব।
➥ প্রতিরোধের মাধ্যম: সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ – এই উপলব্ধি এবং আখেরাতের পরম সত্যকে সামনে রাখা। আল্লাহ বলেন:
সম্পদের অহংকারকারীকে ধ্বংস করার পর আল্লাহ বলেন, “আর তুমি তাদের কাছে পার্থিব জীবনের উপমা পেশ করো – বৃষ্টির পানির মতো, যা আমি আকাশ থেকে বর্ষণ করি, ফলে এর সাথে পৃথিবীর উদ্ভিদ ঘন-সবুজ হয়ে ওঠে, তারপর তা শুষ্ক চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় যা বাতাস উড়িয়ে নিয়ে যায়। আল্লাহ সব কিছুর ওপর ক্ষমতাধর।” (সূরা কাহাফ: ৪৫)
➥ বাস্তব প্রয়োগ: সম্পদকে কেবল চলাচলের উপায় মনে করা, সুদি ঋণ ও অপ্রয়োজনীয় বিলাসী ভোগবাদ এড়িয়ে সহজ-সরল জীবনে সন্তুষ্ট থাকা।
৩. জ্ঞানের ফিতনা ➔ বিনয় ও আত্মমর্যাদার সঠিক অনুপাত
➥ কাহিনী: হযরত মুসা (আ.) ও হযরত খিজির (আ.) -এর ঐতিহাসিক সফর।
➥ দাজ্জালি ফিতনা: কেবল দৃশ্যমান ও বস্তুগত বিজ্ঞানকে সত্য মনে করা, পরম সত্যকে অস্বীকার করা এবং অহংকারী অতি-যুক্তিবাদ।
➥ প্রতিরোধের মাধ্যম: ঐশ্বরিক জ্ঞানের সামনে চরম বিনয় এবং ধৈর্য। খিজির (আ.) যখন বললেন, “আপনি আমার সাথে ধৈর্য ধরতে পারবেন না,” তখন মুসা (আ.) বিনয়ের সাথে বলেছিলেন:
“ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন এবং আমি আপনার কোনো আদেশের অবাধ্য হব না।” (সূরা কাহাফ: ৬৯)
➥ বাস্তব প্রয়োগ: মানবীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা অনুধাবন করে ঐশ্বরিক ও ফিতরি জ্ঞানের সামনে সমর্পিত হওয়া; অহংকার ত্যাগ করে বিনয়ের সাথে নিগূঢ় সত্যের সন্ধান করা।
৪. ক্ষমতার ফিতনা ➔ ইনসাফ, ইখলাস ও জনকল্যাণ
➥ কাহিনী: ন্যায়পরায়ণ ও শক্তিশালী বাদশাহ জুলকারনাইনের ইয়াজুজ-মাজুজের হাত থেকে বিশ্ব রক্ষার ঘটনা।
➥ দাজ্জালি ফিতনা: অহংকারী বিশ্বব্যবস্থা, দমনপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৃতির ফিতরাত নষ্ট করা।
➥ প্রতিরোধের মাধ্যম: ক্ষমতাকে আল্লাহর আমানত মনে করা, লোকদেখানো বা স্বার্থ ত্যাগ করা এবং ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা। জুলকারনাইন প্রাচীর নির্মাণের পর নিজের কৃতিত্ব না দিয়ে বলেছিলেন:
“এটি আমার রবের এক বিশেষ রহমত।” (সূরা কাহফ: ৯৮)
➥ বাস্তব প্রয়োগ: নিজের পরিবার, কাজ বা সমাজে যেটুকু কর্তৃত্ব আছে, সেখানে ইনসাফ বজায় রাখা এবং আত্মম্ভরিতা থেকে মুক্ত থাকা।
সূরা আল-কাহফ আমাদের শেখায় যে দাজ্জালি চক্রান্তের চার দরজার বিপরীতে চারটি আধ্যাত্মিক ঢাল রয়েছে – সৎ সঙ্গ, আখেরাতমুখী পরহেজগারি, জ্ঞানে বিনয় এবং ক্ষমতায় ইনসাফ। এই চারটির সমন্বয়েই শেষ জামানায় ফিতরাত ও ঈমান সুরক্ষিত থাকবে।

আজকের আধুনিক, প্রযুক্তি-নির্ভর ও বস্তুবাদী যুগে দাজ্জালি ফিতনা ও ফিতরাত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে এই চার কাহিনী থেকে অত্যন্ত মূল্যবান বাস্তবসম্মত ব্যবহারিক শিক্ষা গ্রহণ করা যায়:
১. মূল সংকট: আসহাবে কাহফের যুবকরা এমন এক সমাজে বাস করতেন যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা সম্পূর্ণ নাস্তিক্যবাদী ও বস্তুবাদী শক্তির অধীনে ছিল। তারা ইমান বাঁচাতে সমাজ থেকে দূরে গুহায় আশ্রয় নিয়েছিলেন। বর্তমান যুগে ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, কর্মস্থল ও চারপাশের পরিবেশ আমাদেরকে অবচেতনভাবেই বস্তুবাদ ও সংশয়বাদের দিকে ঠেলে দেয়।
ব্যবহারিক প্রয়োগ: পরিবার, কর্মক্ষেত্র ও চারপাশে এমন একটি ইতিবাচক ও দ্বীনি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে বস্তুবাদী ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিরাপদে থাকা যায়। দ্বীনদার ও ফিতরাত-বান্ধব সঙ্গ ঈমান ও নৈতিকতা ধরে রাখতে সাহায্য করে।
২. মূল সংকট: সম্পদের অহংকার এবং বস্তুগত প্রাচুর্যের মোহ মানুষকে আল্লাহ বিমুখ করে দেয়। বর্তমান যুগে কনজিউমারিজম বা অতিরিক্ত ভোগবাদ আমাদের অবচেতন মনে এই শিক্ষাই দেয় যে – “যার যত বেশি ব্র্যান্ডের জিনিস বা টাকা আছে, সে তত সফল।”
ব্যবহারিক প্রয়োগ: অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা পরিহার করে অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা তৈরি করা। আরবিতে এটিকে কানাআত (Qana’at) বলে যার অর্থ হলো সন্তুষ্টি, পরিমিতিবোধ ও মনের প্রশান্তি। ইসলামি পরিভাষায় এর বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে:
➥ যা পাওয়া যায়নি তার জন্য আফসোস না করা এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর শান্ত থাকা।
➥ আল্লাহ তাআলা মানুষকে যা দিয়েছেন, তাতেই সন্তুষ্ট থাকা এবং অতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় লোভ থেকে দূরে থাকা।
➥ অন্যের সম্পদ বা অবস্থার সাথে নিজের তুলনা করে মন খারাপ না করা।
➥ ইসলামি দর্শনে কানাআত বলতে ‘প্রকৃত সম্পদ’ বা মনের সচ্ছলতা বলা হয়েছে। হজরত আলী (রা.) ও ইবনুল কাইয়ুমের মতে – “কানাআত হলো এমন এক ধনভাণ্ডার যা কখনো ফুরিয়ে যায় না”।
অর্থাৎ দুই বাগানের মালিকের কাহিনী থেকে শিক্ষা হলো সম্পদের মোহ ও ভোগবাদ থেকে দূরে থাকা। প্রকৃত সম্পদ (কানাআত) -এর সন্ধান করা।
৩. মূল সংকট: আধুনিক শিক্ষার অহংকার মানুষকে অতিরিক্ত বস্তুবাদী ও বিজ্ঞানসর্বস্ব করে তোলে। সবকিছুকে খালি চোখে দৃশ্যমান প্রমাণের মাপকাঠিতে বিচার করার ফলে অলৌকিকতা, পরকাল এবং দ্বীনি সত্যগুলো থেকে মানুষ দূরে সরে যায়।
ব্যবহারিক প্রয়োগ: প্রশ্ন করার স্বাধীনতার সাথে সাথে বিনয় শেখা উচিত। কারো কৌতূহলকে দমিয়ে না দিয়ে তার কথা শোনা, এবং একই সাথে এটা মাথায় রাখা যে মানবীয় বুদ্ধিমত্তা ও বিজ্ঞানের একটি নির্দিষ্ট সীমা আছে। সবকিছুর পেছনে এক অদৃশ্য ঐশ্বরিক হিকমত বা প্রজ্ঞা কাজ করে। নিজের জানাশোনা বা অর্জিত সাফল্য নিয়ে গর্ব না করে সবসময় শিক্ষানবিস মানসিকতা বজায় রাখা উচিত।
মুসা (আ.) ও খিজির (আ.) -এর কাহিনী থেকে জ্ঞানের অহংকার ভাঙা ও বিনয়ী হওয়ার এটাই শিক্ষা পাওয়া যায়।
৪. মূল সংকট: জুলকারনাইনকে আল্লাহ বিশাল ক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত সামর্থ্য দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি অহংকার না করে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেছিলেন এবং দুর্বল ইয়াজুজ-মাজুজের ফিতনা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার জন্য প্রাচীর নির্মাণ করেছিলেন। আজ জাগতিক ক্ষমতার কারণে গ্লোবাল এলিটসরা মহা অহংকারী হয়ে গেছে। বাস্তব জীবনে অথবা আজকের প্রযুক্তির যুগে ডিজিটাল মিডিয়ায় এক ধরণের ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতা পেয়ে মানুষ অহংকারী হয়ে গেছে।
ব্যবহারিক প্রয়োগ: গ্লোবাল এলিট পরিবারগুলোর বৈশ্বিক দাজ্জালি চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন হওয়া। কোন কোন ক্ষেত্রগুলোতে সুক্ষ চক্রান্তের মাধ্যমে সৃষ্টির ফিতরাত নষ্ট করা হয়েছে এবং হচ্ছে, চিহ্নিত করে পুনরায় ইনসাফ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা উচিত। ইউটিউব, ফেসবুক ইনফ্লুয়েন্সার হয়ে জাগতিক ক্ষমতার অপপ্রয়োগ অথবা সম্পদ, তথাকথিত ডিগ্রী বা রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দম্ভ না করে সমাজ ও বিশ্বে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে জুলকারনাইনের কাহিনী আমাদের শিক্ষা দেয়।
সূরা আল-কাহফের এই চার শিক্ষা চারটি ফিতনাকে চিহ্নিত করে, একইসাথে ফিতনা থেকে ফিতরাতকে ফিরিয়ে আনার শিক্ষা দেয়। মনে করিয়ে দেয় যে, শেষ জামানার ফিতনা থেকে রক্ষা পাবার উপায় হলো বস্তুবাদী দৌড় থেকে বের হয়ে এসে ঈমান, সন্তুষ্টি (কানাআত), জ্ঞানগত বিনয় এবং দায়িত্বশীল নৈতিকতার ছাঁচে নিজেকে প্রস্তুত করতে হবে।
ফিতরাত ও ইমাম মাহদি
ইসলামি দর্শনে দাজ্জালি ব্যবস্থার চূড়ান্ত রূপ হলো মানুষের শারীরিক, সামাজিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ফিতরাত (স্বাভাবিক ও বিশুদ্ধ প্রকৃতি) পুরোপুরি বিকৃত করা। অন্যদিকে, ইমাম মাহদির আগমন হলো সেই চরম অন্যায্যতা ও কৃত্রিমতার অন্ধকার থেকে সমগ্র মানবজাতিকে পুনরুজ্জীবিত করে বিশ্বজুড়ে ফিতরাত ও ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনার ঐশ্বরিক বিপ্লব।
দাজ্জালের ফিতরাত ধ্বংস এবং ইমাম মাহদির ফিতরাত পুনরুদ্ধারের এই গভীর সম্পর্কটিকে কয়েকটি মৌলিক দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা যায়:
হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, ইমাম মাহদি এমন এক সময়ে আত্মপ্রকাশ করবেন যখন বিশ্ব অন্যায়, অবিচার ও নৈতিক ধসে পরিপূর্ণ হয়ে যাবে।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন:
“পৃথিবী যখন অন্যায় ও অবিচারে পূর্ণ হয়ে যাবে, তখন তিনি (ইমাম মাহদি) এসে একে ইনসাফ, ন্যায়বিচার ও ভারসাম্যে পূর্ণ করে দেবেন – যেমনটা আগে অন্যায়ে পূর্ণ ছিল।” (আবু দাউদ)
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই ‘অন্যায় ও অবিচার’ কেবল রাজনৈতিক শাসন বা যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি হলো প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধে গিয়ে মানব রূপ, পারিবারিক ব্যবস্থা, খাদ্যাভ্যাস এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে সুপরিকল্পিতভাবে বিকৃত করা। ইমাম মাহদির আগমন এই কৃত্রিম শাসনব্যবস্থা ও দাজ্জালি বিকৃতির অবসান ঘটাবে।
তিনি কোনো নতুন দ্বীন বা বিধান আনবেন না; বরং মহানবী (সা.) -এর মূল শিক্ষার বিশুদ্ধ রূপে সমাজকে ফিরিয়ে নিয়ে আসবেন। মানুষের হৃদয়ে একক আল্লাহর আনুগত্য এবং সরল-সোজা জীবনের আত্মিক রূপ পুনরুজ্জীবিত করবেন।
এককথায়, দাজ্জালের কাজ হলো কৃত্রিমতা ও ধোঁকার মাধ্যমে মানুষকে তার খাঁটি ‘ফিতরাত’ থেকে বিচ্ছিন্ন করে শয়তানি ব্যবস্থার অধীনস্থ করা; আর ইমাম মাহদির আগমন হলো সেই অন্ধকারের জাল ছিন্ন করে মানবজাতিকে তাদের মূল রূপ – অর্থাৎ বিশুদ্ধ ফিতরাত, আত্মিক স্বাধীনতা, ইনসাফ ও প্রকৃতির ঐশ্বরিক ভারসাম্যে ফিরিয়ে আনার চূড়ান্ত সূচনা।
ফিতরাতের সৈনিক
ইসলামি এ্যাস্কেটোলজি ও হাদিস শরিফের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শেষ জামানায় ফিতনা থেকে ফিতরাত ফিরিয়ে আনার সৈনিক হওয়া কেবল একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক যাত্রা বা শারীরিক অংশগ্রহণের বিষয় নয়; বরং এটি হলো একটি মানসিক, নৈতিক, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক প্রস্তুতি।
রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, শেষ জামানায় ফিতনা এত তীব্র ও বিভ্রান্তিকর হবে যে, একজন মানুষ সকালে মুমিন থাকবে কিন্তু বিকেলে কাফির বা ঈমানহারা হয়ে যাবে। দাজ্জালি চক্রান্ত ও বিভ্রান্তি চরম আকার ধারণ করবে। এসব ফিতনা থেকে ফিতরাত পুনরুদ্ধারের মহাবিপ্লবের সৈনিক হওয়ার প্রথম শর্ত হলো নিজের আকিদা ও ঈমানকে ভেজালমুক্ত ও সুদৃঢ় রাখা। সত্য ও মিথ্যার মানদণ্ড চেনার জন্য কুরআন ও সহীহ হাদিসের জ্ঞান অর্জন করা। যেকোনো ধরনের শিরক, বিদআত, বস্তুবাদ ও সংশয়বাদ থেকে মুক্ত থেকে বিশুদ্ধ তাওহীদের ওপর জীবন গঠন করা। এই সৈনিকরা হবেন অত্যন্ত পরহেজগার, সংযমী এবং রাতের ইবাদতকারী ও দিনের বীর যোদ্ধা।
রাহবানুন বিল-লাইলি, ফুরসানুন বিন-নাহার
রাহবানুন বিল-লাইলি, ফুরসানুন বিন-নাহার হলো ইসলামের ইতিহাসে রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর সাহাবিদের চরিত্র ও বীরত্ব বোঝাতে ব্যবহৃত একটি অত্যন্ত বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক উক্তি। সহজ কথায় এর অর্থ হলো – “তারা রাতে দরবেশ, দিনে বীর যোদ্ধা”।
রাহবানুন বিল-লাইল (রাতের ইবাদতগুজার): সাহাবিগণ রাতের অন্ধকার নেমে এলে আল্লাহর ভয়ে ও ভালোবাসায় সিজদায় লুটিয়ে পড়তেন, দীর্ঘ সময় নামাজে দাঁড়িয়ে কাঁদতেন এবং পুরো রাত ইবাদত ও কুরআন তিলাওয়াতে কাটিয়ে দিতেন। তাদের এই গভীর আধ্যাত্মিকতা দেখে মনে হতো তারা যেন নির্জনবাসী কোনো দরবেশ।
ফুরসানুন বিন-নাহার (দিনে বীর যোদ্ধা): আবার যখন সকাল হতো, তখন তারা সমাজ সংস্কারে, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে ময়দানে বীরের মতো ঝাঁপিয়ে পড়তেন। ঘোড়ার পিঠে চড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রু মোকাবিলায় তাদের চেয়ে সাহসী আর কেউ হতো না।

পটভূমি: রোমান বা পারস্য সম্রাটদের গোয়েন্দারা যখন মুসলিম বাহিনীদের রণকৌশল ও জীবনযাত্রা গোপনে পর্যবেক্ষণ করতো, তখন তারা নিজ দেশে ফিরে গিয়ে মুসলিমদের এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কথা জানাত। তারা বলত যে, এই জাতি রাতে আল্লাহর সামনে কাঁদে আর দিনে সিংহের মতো গর্জে ওঠে। এটিই ছিল সাহাবিদের বিজয়ের মূল রহস্য – আধ্যাত্মিক শক্তি ও শারীরিক বীরত্বের এক অপূর্ব সমন্বয়।
ফিতরাতের সৈনিকরা অবশ্যই কবিরা গুনাহ, বিশেষ করে হারাম উপার্জন, জিনা, সুদ ও গীবত থেকে অন্তর ও শরীরকে পবিত্র রাখবে। অতিরিক্ত ভোগবাদ, সোশ্যাল মিডিয়ার আসক্তি এবং দাজ্জালি সিস্টেমের কৃত্রিম জীবন থেকে বের হয়ে সহজ-সরল ও ফিতরাত-বান্ধব জীবনযাপনে অভ্যস্ত থাকবে।
কোন বাহিনীর সৈন্য হতে হলে শত্রুর কৌশল জানা জরুরি। আধুনিক মিডিয়া, সুদি অর্থনীতি, সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এবং ফিতরাত ধ্বংসের যে বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্ক কাজ করছে – সেগুলো চেনা ও তার বিরুদ্ধে নিজেকে ও পরিবারকে সুরক্ষিত রাখা। এজন্য নিয়মিত সূরা কাহফ পড়া ও এর অর্থ হৃদয়ঙ্গম করা, যাতে দাজ্জালি ধোঁকা বিভ্রান্ত করতে না পারে।
শেষ জামানা কোন আরাম-আয়েশের সময় না। অনাহার, চরম অভাব এবং প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করার শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুতি থাকবে।
এই সৈনিক হওয়ার জন্য অর্ডিন্যান্স বা আনুগত্যের শিক্ষা অত্যাবশ্যক। জুলুম বা অন্যায়ের মুখে অধৈর্য না হয়ে সত্যের ওপর টিকে থাকা। লক্ষ্য বাস্তবায়নে শৃঙ্খলাবদ্ধ হওয়া এবং সহযোদ্ধা সৎ সঙ্গ এবং সত্যিকার বুজুর্গদের সাহচর্য গ্রহণ করা।
শেষ জামানার ঘোর ফিতনা ও দাজ্জালি বিভ্রান্তি সত্ত্বেও তাদের অন্তরে ঈমান নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহ বা দ্বিধা থাকবে না। তাদের অন্তর হবে লোহার টুকরোর মতো মজবুত। লোহা যেমন সহজে বাঁকানো যায় না, তাদের ঈমানকেও কোনো ফিতনা বিচ্যুত করতে পারবে না।
সত্যের পতাকাতলে দাঁড়িয়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করতে কাউকে ভয় পাবে না। অন্তরে শাহাদাতের তামান্না থাকবে সর্বোচ্চ। দ্বীনি শৃঙ্খলায় তারা হবে অত্যন্ত কঠোর। সঠিক নেতৃত্ব ও হকের আদেশের সামনে তারা পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও শৃঙ্খলা বজায় রাখবেন।
যেকোনো চরম অভাব, অনাহার বা প্রতিকূল পরিবেশেও তারা বিচক্ষণতা ও অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিবে। কোন প্রকার জাগতিক পদবী, পরিচিতি, ক্ষমতা বা অর্থ-সম্পদের লোভে কারো সাথে যুক্ত হবে না।
দাজ্জালি ব্যবস্থার অতি-ভোগবাদ এবং বিলাসী জীবন সম্পূর্ণ ত্যাগ করে সুন্নাহসম্মত সহজ-সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হবে। পারস্পরিক ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং ইমানি ভ্রাতৃত্ব হবে অতুলনীয়। নিজেদের মধ্যে কোনো হিংসা, বিদ্বেষ বা আত্ম অহংকার থাকবে না।
বিখ্যাত হতে চাইবেন না; বরং সামাজিকভাবে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকা সাধারণ, বিনয়ী কিন্তু আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত মাকবুল মানুষ হবেন। বাহ্যিক শক্তি বা সরঞ্জামের চেয়ে আত্নিক বিশুদ্ধতা, গভীর রাত্রে আল্লাহর সামনে সিজদাবনত হওয়া, খাঁটি তওবা এবং ফিতরাত ও সুন্নাহর ওপর অবিচল থাকাটাই হবে আসল শক্তি।
ফিতরাতের সৈনিকদের দলে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি রাজপথে খোঁজার আগে নিজ অন্তর, পরিবার ও আমলে শুরু করতে হবে। যারা আজ নিজের নফস, শয়তানি ধোঁকা এবং আধুনিক দাজ্জালি ফিতনার বিরুদ্ধে লড়াই করে নিজের ফিতরাত ও ঈমান রক্ষা করতে পারছে – সৌভাগ্যবান হলে জীবদ্দশায় ইমাম মাহদির আগমন ঘটলে তারাই ইনশাআল্লাহ তার পাশে দাঁড়ানোর তৌফিক পাবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো নিয়ত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মানুষের হাশর বা বিচার হবে তার নিয়তের ওপর ভিত্তি করে। কাজেই, কেউ যদি অত্যন্ত সচ্চরিত্রবান হয়ে আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে দুআ করে- “হে আল্লাহ! শেষ জামানায় যখন তোমার দ্বীনের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য ইমাম মাহদি আসবেন, আমাকে ও আমার পরিবারকে তার খাঁটি আনসার হিসেবে কবুল করো”—তবে সেই ব্যক্তি যদি ইমাম মাহদির আগমনের আগেই মৃত্যুবরণও করে, মহান আল্লাহ তাকে তার নিয়তের কারণে মাহদির বাহিনীর সওয়াব দান করতে পারেন।
বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, ইমাম মাহদির প্রাথমিক ও সবচেয়ে অনুগত সাথীদের সংখ্যা হবে বদর যুদ্ধের শহীদ/গাজীদের সংখ্যার মতো – অর্থাৎ ৩১৩ জন। পরবর্তীতে বিশ্বজুড়ে খাঁটি মুমিনরা তাদের সাথে এসে যুক্ত হবেন। এই অল্প সংখ্যক মানুষই পুরো বিশ্বের ঈমানি রূপরেখা বদলে দিতে ভূমিকা রাখবেন।
তিন বছরের বিনিয়োগ পরিকল্পনা
সূরা কাহাফ হলো ফিতরাতের মূল পথ। কেউ আগামী তিন বছর সূরা কাহাফের বর্ণিত চারটি মূল ফিতনার প্রতিরোধ ব্যবস্থাগুলি (সৎ সঙ্গ, আখেরাতমুখী পরহেজগারি, জ্ঞানে বিনয় এবং ক্ষমতায় ইনসাফ) জীবনে পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে চাইলে সুপরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রতিটি স্তরে কাজ করার জন্য এবং বাস্তবায়নের জন্য তিন বছর সময় যথেষ্ট। এখনই শুরু করুন। ২০২৯ সাল বা তার আগেই প্রস্তুত হয়ে যাবেন।
পরিকল্পনাটি প্রতি বছর নতুন একটি স্তরের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করবে, আর আগের বছরের কাজগুলোর চর্চাও অব্যাহত থাকবে। পরের কাজ আগে করা যাবেনা তা নয়, অথবা সম্ভব হলে লক্ষ্য ঠিক রেখে একসাথেও শুরু করা যায়। আগে পরের হেরফের হলেও লক্ষ্য স্থির থাকবে।

সূরা কাহাফের চারটি ধাপ শুরুর আগে অভিজ্ঞতার আলোকে প্রাথমিক কিছু বিষয় উল্লেখ করছি:
➥ প্রথমেই মিথ্যা বলা বাদ দিন। দিনে একটিও মিথ্যা বলবেন না। এই একটি চর্চা বাকি বহু সঠিক পথ উন্মুক্ত করে দিতে সাহায্য করবে।
➥ ইনকাম ঠিক করুন। সুদ, ঘুষ দুর্নীতিতো না-ই। এমনকি ঘুষ দিয়ে/ তদবীর করে চাকরী নিয়ে থাকলে ছেড়ে দিন। অন্যের হক নষ্ট করেছেন। এটা ছেড়ে দেয়া হিজরত করে ফিরে আসার মতো।
➥ দুনিয়াবি বাড়তি সুবিধা, ভোগবিলাশের জন্য বিদেশ গিয়ে থাকলে ফিরে আসুন।
➥ হাইপার ইনফ্লেশন ঘটানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এ থেকে বাঁচার সবচেয়ে উত্তম উপায় হলো দৈনন্দিন চাহিদাকে যার পর নাই ন্যুনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা।
➥ শেষ জামানা সম্পর্কে সচেতন হোন। হাজারো ফিতনা, বিভ্রান্তির মাঝে নিগূঢ় সত্যকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন।
➥ ফরজ ইবাদতের পাশাপাশি জিকির করুন, আল্লাহর কাছে পুরোপুরি আত্নসমর্পণ করুন। রোম সাম্রাজ্য ও সূরা কাহাফের ইতিহাস জানুন। সূরা কাহাফ কেনো এ সময়ের ঢাল তা বুঝে আমল করার চেষ্টা করুন।
➥ প্রকৃতির মাঝে ফিরে আসুন। প্রাকৃতিক খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করুন। হাইব্রিড, জিএমও, উচ্চফলনশীল উদ্ভিদ/প্রাণীজ খাবার এড়িয়ে চলুন। এমনকি দামি দামি প্রোটিন পাউডার, ফুড সাপ্লিমেন্টের দিকে না ঝুঁকে শরীর প্রস্তুত করার জন্য দেশী বীজের উদ্ভিদ ও প্রাণিজ খাবার সংগ্রহের চেষ্টা করুন।
➥ মধ্যস্বত্বভোগী আড়তদার না, সম্ভব হলে সরাসরি কৃষক/উৎপাদকের কাছ থেকে দেশীয় খাবার সংগ্রহ করুন। কৃষি ক্ষেত্রে এই একটা কৌশলই বিপ্লব ঘটিয়ে দিতে পারে। ভাবছেন একলা করে কি হবে? ১জন, ১০জন, ১০০জন এভাবেই হাজার জন হয়। এর থেকে সহজ বিপ্লব আর কিছু হতে পারে না। বাহারি প্যাকেটজাত খাবার প্রস্তুতকারক সবাই মধ্যস্বত্বভোগী। এসব এড়িয়ে চলুন।
➥ অসুস্থ্য হলে প্রথমে আল্লাহকে স্মরণ করুন। এরপর ঘরোয়া প্রকৃতিক চিকিৎসায় সুস্থ্য হওয়া সম্ভব কিনা খতিয়ে দেখুন। বাঙালির রান্নাঘর পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ফার্মেসী। কিন্তু সেগুলো দিয়ে যে প্রক্রিয়ায় সুস্বাদু খাবার তৈরি হয় তাতে অধিকাংশ ঔষধি গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়। প্রাকৃতিক চিকিৎসা এবং দোয়া কালামের মাধ্যমে অনেক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। মাত্র ১০০ বছর আগেও আমেরিকায় প্রাকৃতিক ও হোমিও চিকিৎসায় মানুষ সুস্থ্য হয়ে যেতো। সেখান থেকে মানুষকে টেনে বের করে সিন্থেটিক পিলে অভ্যস্ত করা হয়েছে যা ফিতরি ব্যবস্থা নষ্ট করার রূপান্তর প্রক্রিয়ারই অংশ। এমন কোন রোগ নেই যার পথ্য প্রকৃতিতে নেই। তবে যেহেতু আগের মতো অভিজ্ঞ হেকিম ও প্রাকৃতিক শেফা খানা নেই; তাই জরুরী প্রয়োজনে আধুনিক চিকিৎসা নিতে হবে। ডক্টর ফর এ্যামার্জেন্সি অনলি।
➥ ফ্লাট বাসা নামক আধুনিক খাঁচা থেকে বের হোন। উঠানযুক্ত বাড়ি বসবাসের জন্য আদর্শ, যেখানে কিছু গাছ থাকবে, পশু-পাখি পালা যাবে। ধনীরা যেভাবে ডুপ্লেক্স বাড়ি বানিয়ে আশেপাশে পর্যাপ্ত ফাঁকা জায়গা, সুইমিং পুল, খেলার মাঠ রাখে। ঢাকা ছেড়ে আশপাশের গ্রামে গিয়ে একজন মধ্যবিত্তের পক্ষ্যেও এমনটা করা সম্ভব।
➥ সার্বিক পরিস্থিতিতে বলা যায়, এই মূহুর্তে ঢাকা ছাড়া সম্ভব না হলেও শহরের মূল কেন্দ্র থেকে বের হয়ে যান এক্ষুনি। গ্রাম অথবা শহরের একদম প্রান্তে, শহরতলি; যেখানে জীবন এখনও প্রকৃতির খুব কাছাকাছি। সম্ভব হলে সমমনা মানুষরা সেখানে ঐক্যবদ্ধ হোন।
সূরা কাহাফের আলোকে তিন বছরের বিনিয়োগ পরিকল্পনা:
প্রথম বছর (১-১২ মাস): ঈমানের ফিতনা প্রতিরোধ, ফিতরাত-বান্ধব সঙ্গ ও পারিবারিক দুর্গ নির্মাণ
ঈমান হলো ফিতরাতের ভিত্তি। আর সৎ সঙ্গ হলো ঈমানকে বাঁচানোর প্রধান হাতিয়ার। প্রথম বছরের লক্ষ্য হলো, আপনার পরিবার এবং আশেপাশের সবচেয়ে আপন মানুষদের নিয়ে একটি ঈমানি পরিবেশ তৈরি করা এবং নিজের ঈমানকে সুদৃঢ় করা।
১-৩ মাস: আত্মবিশ্লেষণ ও সূরা কাহাফ মুখস্থকরণ
নিজের সঙ্গদোষ এবং মানসিকতায় কোনো বস্তুবাদী বা দুনিয়াদারী ধারণা আছে কি না তা গভীরভাবে চিহ্নিত করুন। দুনিয়ার সৌন্দর্য ও চাকচিক্য আপনাকে কতটা প্রলুব্ধ করে তা বোঝার চেষ্টা করুন। অন্তত সূরা কাহাফের প্রথম এবং শেষ দশটি আয়াত মুখস্থ করে প্রতি শুক্রবার অর্থ বুঝে পড়ার অভ্যাস করুন।
৪-৬ মাস: সৎ সঙ্গ বা সহবত নির্বাচন ও পারস্পরিক বন্ধন
আপনার বন্ধু এবং কাছের মানুষদের মধ্য থেকে যারা ঈমানদার এবং যাদের সঙ্গ আপনার ঈমানকে বাড়ায়, যারা শেষ জামানা ও বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন, দাজ্জালি চক্রান্ত সম্পর্কে সচেতন, তাদের চিহ্নিত করুন। দুনিয়াদারী বা বস্তুবাদী চিন্তা-চেতনার সঙ্গীদের এড়িয়ে চলা শুরু করুন। আপনি যাদের সাথে সবচেয়ে বেশি সময় কাটান, তাদের নিয়ে একটি ঈমানি বা ফিতরাত-বান্ধব বৃত্ত তৈরি করুন। সূরা কাহফের আয়াত ২৮ অনুযায়ী নিজের মনকে তাদের সাথে ধরে রাখার চেষ্টা করুন।
৭-৯ মাস: ফিতরাত-বান্ধব জীবন ও পারিবারিক পরিবেশ তৈরি
নিজের পরিবারে ঈমানি পরিবেশ তৈরির ওপর সবচেয়ে বেশি জোর দিন। সৌভাগ্যবান না হলে হয়ত নিজের পরিবারই প্রথম বাধা হয়ে দাড়াতে পারে। এটিই প্রথম পরীক্ষা। ধৈয্যের সাথে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করুন। পরিবারে নিয়মিত কোরআন তেলাওয়াত, নামাজের অভ্যাস, শেষ জামানা ও দ্বীনি আলোচনার পরিবেশ তৈরি করুন। আপনার ঘর যেন দাজ্জালি ফিতনার প্রবেশপথ না হয়। সব ধরনের বস্তুবাদী প্রলোভন থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার জন্য মানসিকভাবে দৃঢ় হন।
১০-১২ মাস: সামাজিক স্তরে ফিতরাত পুনরুদ্ধারের প্রাথমিক কাজ
পরিবার এবং আপনার ঈমানি সঙ্গীদের নিয়ে একটি ঈমানি ফিতরাত-বান্ধব দুর্গ নির্মাণ করুন। যাতে এই ফিতরাত-বান্ধব সঙ্গের চর্চা ও পারস্পরিক সাহায্য চলতে থাকে এবং বিস্তার লাভ করে। ফিতরাতের ওপর টিকে থাকার জন্য দ্বীনি জ্ঞান, সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি নিয়ে সচেতনতা অর্জনের প্রতি মনোযোগী হোন। মসজিদভিত্তিক আলোচনা ও প্রতি শুক্রবার জুম্মার খুতবায় সূরা কাহাফের উপর অধিক গুরুত্ব দেয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের নিয়মিত তাগাদা দিতে থাকুন।
দ্বিতীয় বছর (১৩-২৪ মাস): সম্পদ ও জ্ঞানের ফিতনা প্রতিরোধ – আখেরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি ও জ্ঞানে বিনয়
ঈমানের দুর্গ তৈরির পর, দ্বিতীয় বছরের লক্ষ্য হলো সম্পদ এবং জ্ঞানের ফিতনার মোকাবিলা করা। এই স্তরে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি এবং মানসিকতায় গভীর পরিবর্তন আনতে হবে।
১৩-১৫ মাস: সম্পদের প্রকৃত মালিকের ওপর বিশ্বাস ও দুনিয়ার ক্ষণস্থায়িত্ব উপলব্ধি
দুনিয়ার জীবন যে ক্ষণস্থায়ী, তা গভীরভাবে উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। আপনার সম্পদ বা সম্পদ অর্জনের আকাঙ্ক্ষা যেন আপনার ঈমানকে ক্ষুণ্ন না করে, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
আপনার সম্পদের প্রকৃত মালিক যে আল্লাহ – এই উপলব্ধি জাগ্রত করুন। সম্পদের ওপর লোভ বা অহংকার ত্যাগ করুন। সম্পদ অর্জনের চেয়ে সম্পদ আল্লাহর পথে ব্যয় করার মানসিকতা তৈরি করুন। সূরা কাহফের ৪৫ নং আয়াতটি বারবার পড়ুন এবং এর গভীর অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করুন।
১৬-১৮ মাস: সহজ-সরল জীবনযাপন ও সুদি ঋণ বর্জন
সুদি ঋণ, ব্যাংকিং লেনদেন এবং অনাবশ্যক বস্তুবাদী কেনাকাটা সম্পূর্ণভাবে ত্যাগ করুন। সুদি লেনদেন হলো সম্পদ ও রিযিকের ফিতনার প্রধান পথ। সহজ-সরল জীবনে সন্তুষ্ট থাকার অভ্যাস করুন। আপনার জীবনে যেটুকু সম্পদ আছে, তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে শিখুন। সম্পদ কেবল চলাচলের উপায় মনে করুন। বিলাসী ভোগবাদ এড়িয়ে চলুন।
১৯-২১ মাস: ঐশ্বরিক জ্ঞানের সামনে চরম বিনয় ও ধৈর্য ধারণ
নিজের জ্ঞানের অহংকার ত্যাগ করুন। আপনি যে জ্ঞান অর্জন করেছেন, তা আল্লাহরই দান – এই উপলব্ধি জাগ্রত করুন। দুনিয়াবী বা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ওপর অতি-যুক্তিবাদ পরিহার করুন। শেষ জামানার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের আলোকে বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বড় সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোন একটি ভুল করলেই ট্রেইন লাইনচ্যুত হয়ে যাবে। ‘আমিই ঠিক’ জাহির করার আগে তার ভিত্তি নিয়ে বারবার ভাবুন। ভুল হলে সাথে সাথে শুধরে নিন। বিনয়ের সাথে অন্যের মতামত মনোযোগ দিয়ে শুনুন। শেষ জামানা সম্পর্কে সচেতন হোন। হাজারো ফিতনা, বিভ্রান্তির মাঝে নিগূঢ় সত্যকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করুন।
দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্রে হযরত মুসা (আ.) এবং হযরত খিজির (আ.)-এর সফর থেকে ধৈর্য বা সবর-এর শিক্ষা গ্রহণ করুন। দ্বীনি শিক্ষা গ্রহণের সময় নিজেকে বিনয়ী ও ধৈর্যশীল রাখুন। সূরা কাহফের ৬৯ নং আয়াতটি পড়লে এই শিক্ষার গুরুত্ব বোঝা যাবে।
২২-২৪ মাস: ফিতরি জ্ঞান অর্জন ও বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি
মানবীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সীমাবদ্ধতা অনুধাবন করুন। কোরআন ও সুন্নাহর গভীর জ্ঞান অর্জনের ওপর জোর দিন। আধ্যাত্মিক এবং ব্যবহারিক সমাধানের জন্য কোরআনের সাহায্য নিন।
তৃতীয় বছর (২৫-৩৬ মাস): ক্ষমতার ফিতনা প্রতিরোধ ও ফিতরাত পুনরুদ্ধারের সৈনিক হওয়া
তৃতীয় বছরের লক্ষ্য হলো ক্ষমতার ফিতনা মোকাবিলা করা এবং শেষ জামানার ফিতরাতের সৈনিক হিসেবে নিজের অবস্থান নিশ্চিত করা। এই স্তরে আপনার কাজ হবে নিজের কর্তৃত্বের সব ক্ষেত্রে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা।
২৫-২৭ মাস: ক্ষমতাকে আল্লাহর আমানত মনে করা ও লোকদেখানো বা স্বার্থ ত্যাগ করা
নিজের কর্তৃত্বের প্রতিটি ক্ষেত্রকে (পরিবার, কর্মক্ষেত্র বা সমাজ) আল্লাহর আমানত মনে করুন। ক্ষমতার অপব্যবহার পরিহার করুন। ক্ষমতা বা কর্তৃত্বের সব কাজ যেন আল্লাহর জন্য হয়, লোকদেখানো বা নিজের স্বার্থের জন্য না হয়। আপনি যেটুকু কর্তৃত্ব করেন, তা যেন আল্লাহর আমানত হিসেবেই হয়।
২৮-৩০ মাস: নিজের পরিবার, কাজ বা সমাজে ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করা
পরিবার এবং আশেপাশের প্রতিটি ক্ষেত্রে ইনসাফ বা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করুন। নিজের পরিবারে ইনসাফ বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সমাজ বা কর্মক্ষেত্রে যে কর্তৃত্ব করেন, সেখানেও ইনসাফ বজায় রাখুন।
জুলকারনাইনের ক্ষমতার প্রয়োগের আদর্শ নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করুন। নিজের ক্ষমতার কৃতিত্ব না দিয়ে আল্লাহর রহমত মনে করুন (সূরা কাহফ ৯৮ নং আয়াত)।
৩১-৩৩ মাস: ফিতরাত পুনরুদ্ধারের সৈনিক হওয়ার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও আত্মগঠন
চূড়ান্ত প্রস্তুতি: গত ২ বছরের সব কাজ ও শিক্ষাগুলোর ওপর ভিত্তি করে ফিতরাত পুনরুদ্ধারের সৈনিক হিসেবে নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করুন। নিজের ঈমান, আখেরাতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি, জ্ঞানে বিনয় এবং ক্ষমতায় ইনসাফ -এই চারটি ঢালের সমন্বয়ে নিজেকে শক্তিশালী করুন। শেষ জামানার ফিতনার বিরুদ্ধে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্য নিয়মিত কোরআন, দ্বীনি জ্ঞান, বিশ্ব পরিস্থিতি পর্যালোচনা এবং শেষ জামানা সংক্রান্ত আলোচনার চর্চা অব্যাহত রাখুন।
৩৪-৩৬ মাস: ফিতরাত পুনরুদ্ধারের কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ ও নিজের ঈমানি দুর্গ রক্ষা
পরিবার এবং ঈমানি বৃত্তের ওপর ভিত্তি করে মানুষ ও সৃষ্টির ফিতরাতকে ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করুন। নিজের পরিবার এবং ঈমানি সঙ্গীদের নিয়ে নির্মিত দুর্গ রক্ষা করুন। যাতে দাজ্জালি ফিতনার প্রবেশ রোধ করা যায়।
উপরের ক্রমবিন্যাশ শুধুমাত্র একটি ধারনা দেয়ার জন্য। এখানে এমনও হতে পারে ইনকাম ঠিক করে ঘুরে দাঁড়াতেই দুই বছর পার হয়ে যাবে। পরিবার ঠিক করতেই তিন বছর পার হয়ে যাবে। সন্ধায় খেয়ে ১০টার আগেই পরিবারসহ ঘুমাতে যাওয়ার চর্চায় অভ্যস্ত হতে এক বছর পার হয়ে যেতে পারে। প্যাকেটজাত দাজ্জালিক খাবার, রূপান্তরিত বীজ, পুষ্টিহীন দাজ্জালিক বাম্পার ফলনের খাবার-দাবার চেনা ও এগুলো বাদ দিয়ে প্রাকৃতিক খাবারে অভ্যস্ত হতেই তিন বছর পার হয়ে যেতে পারে। দাজ্জালিক ফিতনা, ফাঁক-ফোকর, বৈশ্বিক চক্রান্ত, বিশ্বের হালচাল বুঝতেই তিন বছর পার হয়ে যেতে পারে। বিশেষ করে সাধারণ জনগণ, মুসলমান ও মজলুমদের জন্য বিশ্বব্যাপী যত ফাঁদ পাতা আছে, সঠিক গাইড ছাড়া তা চিনতে অনেক সময় লাগবে। মোট কথা তিন বছরের পরিকল্পনা হাতে নিন। সঠিক সহবত ও আপ্রাণ চেষ্টা অব্যাহত থাকলে তিন বছর আগেই নিজেকে ফিতরাতের মূল পথে ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
এই তিন বছরের পরিকল্পনা ঐক্যবদ্ধ হওয়ারও অন্যতম পূর্বশর্ত। আগে সমমনা একটা শ্রেণী তৈরি হবে। এরপর প্রয়োজন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করবে। এটি কেবল সাধারণ কোন দুনিয়াবি বিনিয়োগ না। যে পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এবং হতে যাচ্ছে তার জন্য এরচেয়ে ভালো বিনিয়োগ আর কি হতে পারে!
শেষ জামানার ফিতনাগুলো সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের মতো ধেয়ে আসছে। এই ঝড়ের বিপরীতে দাঁড়িয়ে ইমান ও ফিতরাত রক্ষা করার অর্থ হলো স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা। এর জন্য প্রয়োজন দৃঢ় সংকল্প, ছোট ছোট সুন্নাহসম্মত অভ্যাসের নিয়মিত চর্চা এবং আল্লাহর ওপর পূর্ণ তাওয়াক্কুল। রাতারাতি কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসে না; এটি শুরু হবে প্রতিদিনের ছোট ছোট সিদ্ধান্তের মাধ্যমে – যেখানে আপনি কৃত্রিমতার বদলে প্রাকৃতিক ও সৃষ্টির সহজাত পথটিকে বেছে নেন।



GIPHY App Key not set. Please check settings